কেউ কথা রাখেনি
জাজাফী২৮ এপ্রিল, ২০১৬ ইং
কেউ কথা রাখেনি
বাঙালির মুখে বুলি ফুটেছে। এখন সে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। তবে সে সব কথা প্রগল্ভতায় ভরা। বাঙালির নতুন নাম দেওয়া যেতে পারে কথা বলার বাঙালি। তবে কথারও লিমিট থাকা উচিত। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমাদের কথা বলার প্রতিযোগিতা। কে কত কথা বলতে পারে সেটাই যেন মুখ্য বিষয়। স্বাধীনতার পর এ দেশটা ক্ষুধা-দারিদ্র্যের চরম পর্যায়ে ছিল। ধীরে ধীরে একটু একটু করে দেশটা অনেকটাই এগিয়েছে। আরো অনেক বেশি এগিয়ে যেতে পারতো যদি আমাদের লাগামহীন কথা বলা বন্ধ করা যেত। চারদিকে আজ কথা কিংবা অকথার ফুলঝুরি। এগুলো আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে।

ক্লাসে শিক্ষকদের কথা বলা কমেছে। তারা বরং ছাত্রদের বলে অমুক চ্যাপ্টার বাসা থেকে পড়ে এসো। অথচ তাদের ক্লাসে কথা বলার কথা ছিল। তাই বলে মাঠে ময়দানে কথা বলা কিন্তু কমেনি। রাজনৈতিক নেতারা গলা ফাটিয়ে কথার ফুলঝুরি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, টিভিতে টকশোতে কতিপয় জ্ঞানীজন জ্ঞান বিলিয়ে যাচ্ছেন। যিনি ওপার বাংলার সিরিয়ালের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়ে বাহবা পাচ্ছেন তার ঘরেই হরহামেশা চলছে জিবাংলা, স্টার জলসা কিংবা ডোরেমন-নবিতাদের নিয়ে মাতামাতি। আজ থেকে অনেক বছর আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটা কবিতা লিখেছিলেন ‘কেউ কথা রাখেনি’। তিনি তার কবিতায় তেত্রিশ বছর অপেক্ষার কথা বলেছেন। আমরা অপেক্ষায় আছি তার থেকেও বেশি। আসলে কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না।

হাটি হাটি পা পা করে উন্নয়নের পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া আজকের বাংলাদেশেও অনেক দৃশ্য আমাদেরকে খুব কষ্ট দেয়, তার একটি হল রাস্তায় ঘুমন্ত মানুষ। এখানে সেখানে ওভার ব্রিজে প্রায়ই দেখা যায় অর্ধেক শরীর রেলিঙের বাইরে রেখে ঘুমিয়ে আছে। একটা বাতাস এলেই ধুপ করে নীচে পড়বে।

কেন এত মানুষ রাস্তায় ঘুমায়? এই প্রশ্নটির উত্তর আমি আপনি সবাই কম বেশি জানি। প্রতিনিয়ত কর্মব্যস্ত এই শহরে গ্রাম থেকে ছুটে আসছে হাজার হাজার মানুষ। ভাগ্য বদলের আশায় ঢাকায় আসা মানুষের অধিকাংশই দিশেহারা হয়ে পড়ছে এ শহরের নির্মমতা দেখে। রাস্তায় রাত কাটানো মানুষগুলোর প্রতি আমাদের যে আবেগ তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যেতে পারে যে, তাদের অধিকাংশ স্বভাবের কারণে তারা রাস্তায় থাকে। চোখ কান খোলা রেখে যারা রাস্তায় চলাচল করে তারা দেখেছেন যে কত মানুষ কতরকম ব্যবসা করেই না দিনযাপন করছে। অনেকেই এক গ্লাস পানিতে একটু লেবু চিপে চিনি মিশিয়ে পাঁচ টাকা দিয়ে বিক্রি করছে। প্রতিদিন দুশো গ্লাস বিক্রি হলেও তার আয় হচ্ছে এক হাজার টাকা। কিংবা খুব সামান্য টাকা দিয়ে কেউ কেউ একটা ওজন মাপার মেশিন কিনে পার্কের সামনে কিংবা অন্য কোথাও বসে যাচ্ছে। স্টেশনে শুয়ে না থেকে একটা ফ্লাস্ক কিনে অনেকেই রাস্তায় চা বিক্রি করছে।

এক হাজার টাকা দিয়ে যে কোনো একটা বস্তিতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা যায়। অর্থাত্ কেউ ইচ্ছে করলেই তার দুদিনের পারিশ্রমিক দিয়ে ফুটপাতে না থেকে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে সুন্দর করে থাকতে পারে। তবু এই কাজটি করবে না ওই সব রাস্তায় শুয়ে থাকা মানুষগুলো। কেননা তারা অলস কিংবা তাদের অধিকাংশই দিনে রাতে নানা অকাজে লিপ্ত থাকে। একদল মানুষ নির্মাণাধীন ভবনে ইট ভাঙবে, রোদে পুড়ে উদাম গায়ে ঠেলাগাড়ি ঠেলবে এবং আরেক দল মানুষ এই কাজটি না করে রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে শুয়ে থাকবে। আমরা কোনো কোনো সাংবাদিকেরা সেই ঘুমন্ত মানুষগুলোর করুণ ছবি তুলে করুণার ক্যাপশন দিবো!

নামাজ পড়ার পর দেখা যায় বাইরে অনেকে ভিক্ষা করছে। তাদের অধিকাংশই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার ক্ষমতা থাকার পরও ভিক্ষা করছে। শরীর না খাটিয়ে যদি দুই-চার পয়সা কামাই করা যায় তাহলে কাজ করে লাভ কি-এই চিন্তাই তাদের মাথায় কাজ করে। ব্রিজে অর্ধেক শরীর রেলিঙের বাইরে রেখে যে যুবক ঘুমিয়ে আছে সে ইচ্ছে করলেই একটা টিনের বাসায় ফ্যান ছেড়ে ঘুমাতে পারতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যে ছেলেটি চাকরি না পেয়ে হীনমন্যতায় ভুগছে; ইচ্ছে করলেই সে পানিতে লেবু চিবিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেতে পারে না। আমাদের এই নিষ্ঠুর সমাজ ব্যবস্থাই তার জন্য এ কাজটাকে কঠিন করে দিয়েছে। কি পরিমাণ মানসিক কষ্টে তারা আছে সেটা আমরা জানার পরও অনুভব করতে চেষ্টা করি না। তাদের পরিপাটি শার্ট প্যান্ট তাদের অর্থ কষ্টের কথা বুঝতে দেবে না। অথচ আমরাই ক্ষমতায় যাবার জন্য প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিতে দ্বিধা করি না। ঘরে ঘরে চাকরি দেবার নামে যে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছি তার কিছুই হয়নি। আগামীতেও আমাদের কথা বলা বন্ধ হবে না।

বেকারত্ব শীতের দিনে কম্বল কালেকশনের কোনো ইভেন্ট না যে একদিন পর সেটা নিয়ে আর ভাবা লাগবে না। লাখ লাখ বেকার যুবকের বছরের পর বছর খালি পকেটের দায়িত্বটা যাদের তারা কেউ কথা রাখেনি। কথা রাখেনি সরকার, বিরোধী দল, হিউম্যান রাইটস, শিল্পপতি, এনজিও... কেউ কথা রাখেনি। কিন্তু তারা কথা বলছে অবিরাম। যাদের কাছ থেকে আমরা কিছু আশা করি... যাদের জন্য বেঁচে থাকতে ইচ্ছে জাগে, সে সব বুদ্ধিজীবীও কথা রাখে নি। অথচ তাদের মুখে টিভিতে হরহামেশাই দিনবদলের কথা শুনতে পাই। কেউ কেউ বলে ‘এবার নতুন কিছু কর’ কিন্তু তারা নিজেরাই নতুন কিছু করে না। কেউ কেউ বলে, ‘জেগে ওঠো আপন শক্তিতে’ কিন্তু তারাই জেগে উঠা মানুষদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ শ্লোগান দেয় “যতদিন আমাদের হাতে থাকবে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ”। কিন্তু বেকারত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্রমাগত নষ্ট পথে পা বাড়াতে বাধ্য হওয়া যুবকটির হাতে দেশ থাকার সুযোগ কোথায়, দেশটাইবা তাহলে পথ হারাবে না কেন? তাহলে এই সব স্লোগান দিয়ে কী হবে? মধ্যবিত্তরা তাদের কষ্ট বুকের ভেতরে রেখে শার্টের বোতাম লাগিয়ে রাখে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, এস এম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল :zazafee¦yahoo.com

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৮ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৮
এশা৭:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:২৭সূর্যাস্ত - ০৬:২৩
পড়ুন