হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের এক মাস
হাসনাত আবদুল হাই২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের এক মাস
অনেক দিন থেকেই আমেরিকার নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণের একশ দিনের ভেতর যে সব পদক্ষেপ নেন এবং নির্বাহী আদেশ দেন তার ভিত্তিতে বিচার করা হয়ে থাকে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেমন হবেন। ভোর হলেই যেমন দিনের চেহারা টের পাওয়া যায় হোয়াইট হাউসে প্রথম একশ দিনও সেইভাবে আভাস দেয় প্রেসিডেন্সি কোন পথে যাবে। অদৃশ্য সব সময়ই অনিশ্চিত এবং দুর্ঘটনার মতো আকস্মিক কিছু ঘটার আগে টের পাওয়ার উপায় থাকে না যার জন্য প্রথম একশ দিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে চার বছরের রাষ্ট্র পরিচালনা সম্বন্ধে উপসংহারে আসা সহজীকরণের পর্যায়ে পড়ে। এ  সত্ত্বেও এই সীমিত সময়ে নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপালনের স্টাইল সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা করতে পারে দেশের মানুষ, বিশেষ করে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প  ক্ষমতা গ্রহণের পর একশ দিন নয়, তিরিশ দিনের কিছু বেশি সময় তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিরিশ দিন একশ দিনের সমান নয়, কিন্তু এরই মধ্যে তার কার্যকলাপ দেখে মিডিয়া থেকে শুরু করে অন্য সব পর্যবেক্ষক বুঝে ফেলেছেন তিনি কোন ধরনের  প্রেসিডেন্ট হবেন এবং কীভাবে দেশ চালাবেন। ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত দেখে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় যে সব কাজ করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন তার সব না হলেও অনেক কিছু বাস্তবায়ন করবেন। দ্বিতীয়ত নির্বাচনী প্রচারণায় যে সব বিষয়ে বিষোদ্গার করেছেন দেখা যাচ্ছে তার কয়েকটা ক্ষেত্রে তিনি স্ববিরোধী হয়ে উল্টো কাজ করছেন। শেষের বিষয়টা নিয়েই প্রথমে আলোচনা করা যাক। তিনি বলেছিলেন ওয়াশিংটনে যে রাজনৈতিক এলিট ক্ষমতা ব্যবহার  করে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করেন তিনি তাদের প্রশাসনের কাছে আসতে দেবেন না। কিন্তু হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ পদ চিফ অব স্টাফ পদে নিয়োগে  তাকে ওয়াশিংটনের ক্ষমতা চক্রেরই একজনকে বেছে নিতে হলো। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি খুব সোচ্চার ছিলেন যে ওয়ালস্ট্রিটের এবং ব্যবসা-জগতের হোমরা-চোমরাদের তিনি প্রশাসন থেকে দূরে রাখবেন। কিন্তু এখানেও নিজের কথার বরখেলাপ করে তিনি ট্রেজারি সেক্রেটারি করলেন ওয়ালস্ট্রিটের এক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারকে। গুরুত্বপূর্ণ সেক্রেটারি অব স্টেট পদে নিয়োগ দিয়েছেন এক তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাকে। কমার্স সেক্রেটারি এবং ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের দায়িত্বও অর্পিত হলো ব্যাংকিং  এবং বাণিজ্য জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট  দুই ব্যক্তির উপর। এদের  অধিকাংশই রাজনীতিতে নবাগত এবং প্রশাসনে অনভিজ্ঞ। যেন এই সব নিয়োগই পর্যবেক্ষকদের চোখ কপালে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল না, তিনি সেটা মনে করে নিজের জামাইকে নিয়োগ দিলেন হোয়াইট হাউসে পরামর্শক হিসেবে। এই সব এবং আরো অন্যান্য নিয়োগের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের প্রচলিত ক্ষমতা-বলয়ে আমুল পরিবর্তন আনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পালন করতে এই তিরিশ দিনেই ব্যর্থ হয়ে গেলেন। শুধু তাই নয় দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে পদত্যাগ অথবা মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে হলো এই তিরিশ দিনের ভেতর, কেননা দেখা গেল প্রথম জন, জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শক গোপনে রাশিয়ার সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ রক্ষা করছেন। প্রশাসনের গোয়েন্দা সংস্থাই এই খবর ফাঁস করে দেওয়ার পর খবরের কাগজে হেডলাইন হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে তাকে পদত্যাগ করতে বললেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং খুব নির্দোষভাবে জানালেন যে তিনি এ সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না। এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না তার নিজের দলের কাছেই। দলের  নেতারা এখন বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে এ সম্বন্ধে তদন্তের জন্য পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। ট্রাম্প ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছেন প্রশাসনের গোয়েন্দা সংস্থা তার পছন্দের লোকের বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার জন্য।  হুমকি দেওয়া হয়েছে যে গোয়েন্দা সংস্থাই হোক  অথবা হোয়াইট হাউস, সেখানকার কেউ বাইরে তথ্য পাচার করে থাকলে শাস্তি দেওয়া হবে। এভাবে হোয়াইট হাউস রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে  সন্দেহ, অপছন্দ এবং চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে এখন প্রায় অন্তর্দ্বন্দ্বের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যে ব্যক্তিকে লেবার সেক্রেটারি করার জন্য মনোনয়ন দিয়েছেলেন ট্রাম্প তার বিরুদ্ধেও যে বিরূপ এবং আপত্তিকর সব তথ্য-সরবরাহ করা হলো সিনেটে শুনানির আগে  সেখানেও যে ষড়যন্ত্রকারীদের হাত রয়েছে সে বিষয়ে নিঃসন্দিহান হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তাকে দুর্বল করার জন্যই এমন করা হচ্ছে ভেবে তিনি প্রশাসনের লোকজনকে দোষ দিচ্ছেন এবং বলছেন তারা আন্তরিক না হলে পদত্যাগ করে চলে যেতে পরে। ইতোমধ্যেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে অনুমোদন ছাড়া কোনো সংস্থায় নিয়োজিত কেউ বাইরের কাউকে তথ্য দিতে পারবে না। অবশ্য আগে কোনো প্রেসিডেন্টের সময় এমন ঢালাও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। এ থেকে ট্রাম্পের স্বৈরাচারী মনোভাব এবং একনায়কতন্ত্র সুলভ প্রশাসনের আভাস দেখতে পাচ্ছেন অনেকেই।

ক্ষমতা নেওয়ার দিন থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একের পর এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করছেন এবং স্বাক্ষর করার পর কলম উপহার দিচ্ছেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মকর্তাদের, এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্সকেও। ছবি তোলার জন্য স্বাক্ষরিত নির্বাহী আদেশ হাতে তুলে সামনে ধরছেন। এই দৃশ্য দেখে অনেকের কাছে মনে হয়েছে একজন বালক যেমন নতুন খেলনা হাতে পেয়ে চঞ্চল হয়ে পড়ে এবং ব্যস্ত হয় সেটা নিয়ে ফেলবার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও যেন একইভাবে সদ্যপ্রাপ্ত ক্ষমতার ব্যবহারে খেলায় মেতে উঠেছেন। তার প্রধান নির্বাহী আদেশের মধ্যেই ছিল সিরিয়া থেকে  উদ্বাস্তুদের তিন মাসের জন্য, অন্য উদ্বাস্তুদের স্থায়ীভাবে এবং সাতটি মুসলিম দেশ থেকে নাগরিকদের  ভিসা থাকলেও চার মাসের জন্য আমেরিকায় আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং  যে-সব অভিবাসীর আমেরিকায় বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, তাদের গ্রেফতার করে ফেরত পাঠানো। এই নির্দেশে বিদেশে তো বটেই, আমেরিকার বিভিন্ন শহরে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়ে গিয়েছে। ‘আশ্রয়দাতা’ বলে পরিচিত যে সব স্টেট, যেমন ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে বেআইনি অভিবাসীদের তারা আশ্রয় দিয়ে যাবে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, যে তিনি সেই সব আদেশ অমান্যকারী স্টেটে ফেডারেল সাহায্য বন্ধ করে দেবেন। একই হুমকি দেওয়া হলো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াকেও, কেননা সেখানকার ছাত্ররা তার ট্রাভেল নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে।

আমেরিকার গণতন্ত্রের শক্তির জায়গা হলো সেখানে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স আছে। রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ ক্ষমতার অপব্যবহার বা অতি-ব্যবহার করতে চাইলে তার মুখের রাস টেনে ধরার সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। ট্রাভেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর দেশি-বিদেশি বিমানবন্দরে ভিসা আছে এমন সব যাত্রী আটকে গেল সেই পরিস্থিতি নিরসনে ফেডারেল কোর্ট থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করা হলো। ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প ফেডারেল আপিল কোর্টে গেলেন কিন্তু সেখানেও আপিলে হেরে গেলেন। কোর্টে হেরে যাওয়ার জন্য দায়ী করলেন পুরাতন অ্যাটর্নি জেনারেলকে যিনি ওবামার সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং আর কয়েকদিন পরই তার মেয়াদ শেষ হবে। জিঘাংসু হতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে বরখাস্ত করলেন ট্রাম্প। সেইসঙ্গে তিনি কোর্টের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে থাকলেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় আমেরিকার পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা অনেক গবেষণা করেছে এবং সেই সব গবেষণার তথ্য ওয়েবসাইটে দেওয়া ছিল। যেহেতু ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকে একটা ধাপ্পাবাজি বলে মনে করেন সেজন্য রাতারাতি ওয়েবসাইট থেকে সংরক্ষিত  সব তথ্য মুছে ফেলা হলো। মর্মাহত হয়ে সংস্থার অনেকেই পদত্যাগ করে চলে গেলেন।

এক নির্বাহী  আদেশে ট্রাম্প সকল সংস্থাকে  বললেন, তারা যে ব্যবসায়ী সংস্থা, ব্যাংক, পুঁজিলগ্নিকারী সংস্থা কারো ওপর নিয়ন্ত্রণের জন্য যেন নতুন কোনো নির্দেশ না দেয়। এর ফলে ওয়ালস্ট্রিটে বিজয় মিছিল বের হলো, কেননা তারা এই সব নিয়ন্ত্রণের ফলে ইচ্ছা মতো মুনাফা অর্জন করতে পারছিল না। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যে ওয়ালস্ট্র্রিটের লোভের মাত্রা নিচে নামিয়ে আনার জন্য ব্যবস্থা নেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেল। এরপর যখন কর্পোরেট ট্যাক্স বসানোর জন্য ঘোষণা দেওয়া হবে তখন ওয়ালস্ট্রিটের জয়জয়কার ষোলোকলায় পূর্ণ হবে। গরিবদের, বেকারদের অবস্থার উন্নতি করবেন বলে ট্রাম্প নির্বাচনের আগে জোর গলায় ঘোষণা দিয়েছিলেন আর তার বিজয়ের পেছনে এই শ্রেণির মানুষেরই সমর্থন ভূমিকা  রেখেছে। দেখা যাচ্ছে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প নিজে যে ধনী শ্রেণির তাদের  স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে যে এই নীতির পরিবর্তন হবে, এ কথা কেউ বলতে পারছে না।

প্রেসিডেন্ট ওবামা তার স্বাস্থ্যনীতি  এবং ওবামা কেয়ার আইনের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি আমেরিকান যাদের হেলথ  ইনস্যুরেন্স ছিল না তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন। এতে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিদের মুনাফা হ্রাস পেয়ে যায় এবং তারা রিপাবলিকান দলের শরণাপন্ন হয়।  দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে ট্রাম্প ওবামাকেয়ার বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  এটাও দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির জন্য হবে আর্থিক  ক্ষতির কারণ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে গিয়ে আমেরিকার যেসব মিত্রদেশ তাদের অধিকাংশকে চটিয়ে দিয়েছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি ব্রিটেনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং ইউনিয়নের অন্যান্য দেশকেও বেরিয়ে আসার জন্য বলছেন। ন্যাটো সংস্থায় আমেরিকার অংশগ্রহণে শর্ত আরোপ করে এবং রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়ে তিনি ইউরোপের অনেক নেতার বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁরা বেশ বুঝতে পারছেন যে, আমেরিকার সঙ্গে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা অক্ষুণ্ন থাকবে না। ফলে নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা যেখানে শান্তি ও প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা থাকবে না।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের বাণিজ্যিকনীতি যে অন্তরায় হবে সে বিষয়ে এখন কোনো দেশেরই সন্দেহ নেই। আর ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতির অনুসরণে তিনি সব দেশের রফতানির ওপর উঁচু হারে শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বেশি আক্রোশ চীন এবং মেক্সিকোর ওপর। কেননা ঐ দুটি দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, তিনি মেক্সিকোর সঙ্গে ‘নাফটা’ নামে যে বাণিজ্যচুক্তি আছে তা হয় বাতিল করবেন অথবা এমনভাবে নতুন চুক্তি করবেন যে মেক্সিকো আর আগের মতো আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা পাবে না। চীনের ক্ষেত্রে কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই, তাই তার বিরুদ্ধে শতকরা ৪০ ভাগ হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।

বাণিজ্য ছাড়াও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বেশ কটি দেশকে ক্ষুব্ধ এমনকি ক্রুদ্ধ করে তুলেছেন ট্রাম্প। প্রায় চল্লিশ বছরের এক চীন নীতি বাদ দিয়ে দুই চীন নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে, এমন বক্তব্য রেখে চীনের নেতাদের ক্ষেপিয়ে দিয়েছেন। মেক্সিকোকে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য খরচ দিতে হবে বলে ঘোষণা দিয়ে সেখানকার প্রেসিডেন্টকে এতই চটিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তার আমেরিকার রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করেছেন। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এর আগে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান আমেরিকা রাষ্ট্রীয় সফর ক্রুদ্ধ হয়ে বাতিল করেননি। ট্রাম্প রিফিউজি গ্রহণের বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছিল তা বাতিল করায় সেখানকার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফানে তার কথা কাটাকাটি হয়েছে। দুদেশের সম্পর্ক এখন বেশ শীতল।

আমেরিকা গত চল্লিশ বছর থেকে প্যালেস্টাইন সমস্যার সমাধান হিসেবে ‘দুই রাষ্ট্র’ নীতি সমর্থন করে আসে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই বলেছেন এক রাষ্ট্রনীতিতেও তাঁর আপত্তি নেই। জাতিসংঘ সংস্থার মহাসচিব সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ করেছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা না হলেও তাদেরও প্রতিক্রিয়া একই হবে? আরব লীগ ইতোমধ্যেই প্রতিবাদ জানিয়েছে।

জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার দুটি দেশেই সেনা ঘাঁটি রয়েছে। ট্রাম্প নির্বাচনের আগেই বলেছেন যে ঐ দুটি দেশকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরো ব্যয় বহন করতে হবে। আমেরিকা এই খরচ বহন করতে পারবে না। এটা হয়তো খুব অযৌক্তিক কথা না, কিন্তু এতদিনের একটা প্রচলিত ব্যবস্থাকে হঠাত্ করে তো বদলানো যায় না। তাছাড়া এসব সিদ্ধান্ত হতে হয় দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে, ঢাক-ঢোল না পিটিয়ে। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে দেশ দুটির আত্মসম্মানবোধে যে আঘাত করা হলো এই উপলব্ধি করার ক্ষমতা নেই ট্রাম্পের।

সর্বশেষ যে দেশকে চটিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটি সুইডেন। ফ্লোরিডায় কয়েকদিন আগে ক্যামপেইন স্টাইলের এক র্যালিতে তিনি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছেন, লুক এ্যাট সুইডেন। দেশটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে অভিবাসীদের ঢুকতে দিয়ে এখন কি বিপদে পড়েছে। সুইডিশ সরকার টুইট মারফত জানিয়েছে ট্রাম্প সে দেশের অভিবাসী নীতি সম্বন্ধে কিছু জানেন না। তাকে এ বিষয়ে অবগত করা হবে। বিদেশি রাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যে শুধু ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে এবং ইসরায়েলের কট্টরপন্থি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গেই তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হয়েছে সন্তোষজনক। এর কারণও স্পষ্ট। ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসায় ট্রাম্প খুশি। কেন খুশি তা বোঝা বেশ মুশকিল। ইউরোপ শক্তিশালী থাকলে আমেরিকারই তো লাভ। দুর্বল ইউরোপ তার কোন স্বার্থে লাগবে? তার চিন্তার লজিক বোঝা মুশকিল। নেতানিয়াহু যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদ, তার দেশের প্রতি সমর্থন জানানো অব্যাহত রাখলেও তাকে এত কদর করার পেছনে কারণ কী থাকতে পারে?

ট্রাম্প কী ঐ ধরনের মানুষই পছন্দ করেন যারা চরমপন্থি, আপসহীন এবং গর্বিত। পর্যবেক্ষকরা তাকে বোঝার জন্য প্রায় মাথার চুল ছিঁড়ছে।

ট্রাম্প সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন। মিডিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে। ওয়াশিংটনে ৭৬ মিনিটের প্রেস কনফারেন্সে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এক পর্যায়ে তাদেরকে আমেরিকার জনগণের শত্রু বলেছেন। মিডিয়ার সঙ্গে আমেরিকার অনেক প্রেসিডেন্টেরই লাভ-হেট সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেই সম্পর্ক কখনোই এমন তিক্ততায় পর্যবসিত হয়নি। যা বর্তমানে হয়েছে। ওয়াশিংটনের পর ফ্লোরিডাতে সস্ত্রীক গিয়ে ক্যামপেইন স্টাইল র্যালিতে ট্রাম্প সাংবাদিকদের চরম মিথ্যাবাদী বলেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে তারা তার বিরুদ্ধে লেগেছে। এখানে ট্রাম্পের উচিত নিজেকে সংযত রাখা কেননা আমেরিকার মিডিয়া খুব শক্তিশালী। মিডিয়াকে চটিয়ে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না তাঁর পক্ষে। মিডিয়া প্রমাণ পেলে তার ক্ষতিও করতে পারে যেমন করেছিল প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগে বাধ্য করে। ইতিহাস থেকে ট্রাম্পের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আর যাই বলা হোক, তার মনে আর মুখের ভেতর যে কোনো পার্থক্য নেই সেই বিষয়টা বেশ স্পষ্ট। তিনি মনের ভেতর যে চিন্তা আসে কোনো কিছু বিচার না করে সঙ্গে সঙ্গে বলে ফেলেন। এই দিক দিয়ে তিনি সরল এবং আন্তরিক। কিন্তু রাজনীতিতে এমন অনিয়ন্ত্রিত সরলতার স্থান নেই। নেতাদের সংযত হয়ে কথা বলতে হয়। ধনুকের ছিলা থেকে একটা তীর বের হয়ে গেলে যেমন তা ফেরানো যায় না, একবার কিছু বলে ফেললে তা প্রত্যাহার করারও উপায় থাকে না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিশাল শক্তির অধিকারী। তার পক্ষে চিন্তা-ভাবনা এবং অন্যের সঙ্গে পরামর্শ না করে কিছু বলা খুব ঝুঁকির বিষয়। ট্রাম্প সেই ঝুঁকি নিয়েই যাচ্ছেন, একের পর এক। তাকে কী পরামর্শ দেবার মতো কেউ নেই? এতই একাকী, নিঃসঙ্গ তিনি? তিনি ঠিকই বলেছেন, ওয়াশিংটন একটা বিপজ্জনক জায়গা।

n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও সাবেক সচিব

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
পড়ুন