অর্থনৈতিক উন্নয়নে উদ্যোক্তা তৈরির বিকল্প নেই
ড. মুহম্মদ মাহাবুব আলী১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
অর্থনৈতিক উন্নয়নে উদ্যোক্তা তৈরির বিকল্প নেই
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরির বিকল্প নেই। সুমগিটার বলেছিলেন যে, যিনি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নে ঝুঁকি নিতে, অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সৃষ্টি করতে এবং শুরুর প্রারম্ভিক খরচ জোগান দিতে পারেন তিনিই উদ্যোক্তা। বস্তুত ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রান্সে উদ্যোক্তা বলতে যারা সামরিক জোগান দিতে পারত তাদের বুঝাত। সপ্তদশ শতাব্দীতে যারা সরকারি কার্যক্রম এবং কন্ট্রাক্টরের কার্যক্রম করত তাদের বুঝাত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আইরিশ-ফ্রান্সে অর্থনীতিবিদ রিচার্ড কানটিলন সর্বপ্রথম উদ্যোক্তা শ্রেণির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের তত্ত্ব কৃষি থেকে শুরু করে শিল্প ক্ষেত্রে প্রয়োগের নির্দেশনা দেন। এদিকে পিটার ড্রেকার উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তির ব্যবহার এবং তার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্ব আরোপ করেন। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যারা কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছেন তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেছেন। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি যে চাঙ্গা তার কারণও স্বপ্রণোদিত হয়ে কাজ করা। বিদেশে বিশেষত উন্নত বিশ্বে অর্থ থাকলে সম্মান হয় না বরং একজনের কারখানা/প্রতিষ্ঠানে কতজন কাজ করে থাকে তার ভিত্তিতে সম্মান নির্ধারিত হয়ে থাকে। এ জন্যে অবশ্য সামাজিক সম্মানও একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। অনেকের মনে প্রশ্ন, উদ্যোক্তা হতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে কিনা? এটি আসলে একটি মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। বিল গেটস, ফোর্ড, ডেল— এরা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি।

১৯৪০ সালে সর্বপ্রথম হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরির ওপর প্রোগ্রাম চালু হয়। ধীরে ধীরে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, উন্নত-অনুন্নত দেশেও উদ্যোক্তা শ্রেণি গঠনের বিষয়টি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেবল হার্ভার্ডেই ৩৬টি প্রোগ্রাম রয়েছে উদ্যোক্তা শ্রেণি গঠনের জন্যে। এমনকি স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি, কর্নেল, ব্রাউনসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টির অধিক ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা তৈরির ওপর শিক্ষা দেওয়া হয়। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরির জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। থাইল্যাণ্ডের নারসিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা শ্রেণির ব্যবস্থাপনার ওপর পোস্ট-ডক্টরেট করার সুযোগ পেয়েছি। আসলে উদ্যোক্তা শ্রেণি দু’ভাবে হয়—একটি হচ্ছে জন্মগতভাবে; আরেকটি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা জানেন কিভাবে ব্যবসা শুরু করতে হয়। আমাদের দেশেও ইদানীং কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজনেস ইনকিউবেটর তৈরি করা হচ্ছে। এটি একটি ভালো দিক। আগে ব্যবসা শিক্ষা, অর্থনীতি শিক্ষার ক্ষেত্রে ল্যাবের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসায় শিক্ষা কার্যক্রমের পাঠ্যক্রমে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা শেষ করে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কার্যক্রম গ্রহণের জন্যে ব্যবস্থা গ্রহণে ল্যাব ফ্যাসিলিটিজ প্রয়োজন—যেমন বিপণনের ক্ষেত্রে কিভাবে প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের যোগাযোগ দক্ষতা তৈরি করবে আবার ফাইন্যান্স স্টুডেন্টের ক্ষেত্রে শেয়ার মার্কেটের উঠানামা শেখার জন্যে ল্যাব থাকলে ছাত্র অবস্থায় তাদের মনোবিকাশ ঘটবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিবিএ/এমবিএ পাস করলেই সরাসরি শেয়ার মার্কেটে যাওয়া যায় না; বরং ছয় মাস ন্যূনপক্ষে ইন্টার্নি করতে হয়। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মোদ্যোগী মানব সম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—যা দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণকে সর্বাগ্রে কাজে লাগায়।

এ মুহূর্তে দেশের ৭৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করে থাকে। আর তাই সরকার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজসমূহের বাজারমুখী গুণগতমান সম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে যুব সমাজ যেন নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত করে। এ প্রকল্পের আওতায় বৃটেনের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামকে প্রশিক্ষণের জন্যে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুবাদে বলতে পারি, এআইটি এক্সটেনশান এবং এমটিসি গ্লোবালও সংযুক্ত করা যেতে পারে যারা যত্ন করে শিক্ষা প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম তৈরি করা এবং ছাত্রছাত্রীর ভেতরে যে সুপ্ত সুকুমার বৃত্তিগুলো আছে তার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। আসলে কর্ম উদ্যোগী শিক্ষা ব্যবস্থাই পারে মানুষের ভেতরে যে অমিত শক্তি রয়েছে তার মাধ্যমে উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা। উদ্যোক্তা সৃষ্টির আধুনিক অর্থ কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা নয় বরং যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে সে প্রতিষ্ঠানে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কাজ করা। এক সময় বলা হতো, শিক্ষার মাধ্যমে মাছি মারা কেরানি তৈরি করা হয়। অথচ বিশ্বায়নের এ যুগে শিক্ষার লক্ষ্য হলো উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে স্ব-উদ্যোগে কর্ম সম্পাদন করা অথবা নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আমাদের দেশের সরকারপ্রধান সর্বাগ্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরির জন্যে আহ্বান জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে পলিটেকনিকগুলোতে উদ্যোক্তা তৈরির মডেল গ্রহণ করা হয়েছে। তবে দেশে এখন পর্যন্ত পলিটেকনিক, বৃত্তিমূলক এবং কারিগরি শিক্ষাকে সম্মানজনকভাবে দেখা হয় না। এটি দুঃখজনক। সামাজিক এ ট্যাবু থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কৃষি ক্ষেত্রে, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজ গঠন,  ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স, শিক্ষা প্রদান প্রতিটি ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করা বাঞ্ছনীয়। আর তা হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে এবং মানুষের কর্মের গতিময়তা বৃদ্ধি পাবে। জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংযুক্ত হবে পরিবর্তনশীলতা আর এ পরিবর্তনশীলতা হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিত্সা। ইদানীং আবার ডিজিটালাইজেশান প্রসেস যুক্ত হয়েছে। গত সাড়ে আট বছর ধরে ডিজিটালাইজেশান প্রসেসে এ দেশের অগ্রযাত্রা হচ্ছে। যেহেতু উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি এবং সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। এ জন্যে আইকিউসির মাধ্যমে আধুনিক যুগোপযোগী এবং বিশ্বায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরির প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। উল্টো করে বললে কর্ম উদ্যোগী শিক্ষা প্রদান করতে গেলে অবশ্যই উদ্যোক্তা হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে লিডারশীপ কোয়ালিটি গঠিত হতে হবে। মুখস্থ বিদ্যার বদলে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে পারে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইন্সটিটিউট ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্সে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট চালু হয়েছে। সেখানে অনতিবিলম্বে মাস্টার ইন এন্ট্রি প্রিনিউরিয়াল ইকোনোমিক্স এবং ব্যাচেলার ইন এন্ট্রিপ্রিনিউরিয়াল ইকোনোমিক্স চালু করা হলে দেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে একটি মহতী উদ্যোগ হবে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এর ফলে দেশে কর্ম উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হবে, দারিদ্র্য দূরীকরণ করা সহজ হবে। বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা তা দূর করতে হলে, অবশ্যই উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। ছোট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পাশাপাশি শিক্ষিত উদ্যোক্তা তৈরি হলে সরকারের ভিশন ২০২১ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। নোবেলবিজয়ী গেরী বেকার, থিউডর শুলটজ, জেমস হেকমেন সব সময় বলেছেন যে, মানব পুঁজির ক্ষেত্রে বিনিয়োগে সাফল্য সুনিশ্চিত। আর বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যে কাজ করছে। উদ্যোক্তা যদি প্রশিক্ষিত হয় তবে জিডিপির হার বৃদ্ধি পাবে।

n লেখক :ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনোমিক্স

ই-মেইল:[email protected]

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৪:২৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:১০
এশা৭:২৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৫
পড়ুন