হজ বিড়ম্বনা আর দেখতে চাই না
আমিনুল ইসলাম মিলন১১ মার্চ, ২০১৮ ইং
হজ বিড়ম্বনা আর দেখতে চাই না

হজ দু’অক্ষরের একটি ছোট শব্দ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ব-মুসলিমের পরম আবেগ অনুভূতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস। জড়িয়ে আছে পবিত্র কাবা গৃহ তওয়াফের প্রাণের আকুতি। ‘লাব্বায়েক আল্লাহুমা লাব্বায়েক’ বলে আরাফাতের ময়দানে হাজির হওয়ার ইচ্ছে প্রতিটি মুসলমানের অন্তরে সুপ্ত থাকে। নিভৃত পল্লীর অতি দরিদ্র মুসলমানটিরও মনের গভীরে হজ পালনের সুপ্ত-আকাঙ্খা লুক্কায়িত থাকে। পল্লীর বাউলরা তাই একতারার সুরে তাদের আকুতি তুলে ধরে-‘দিবানিশি মনরে আমার আর দিও না যন্ত্রণা-ধনে যদি হইতাম ধনী যাইতাম সোনার মদিনা’।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যেখানে মোট হজ যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৫৮৪৬৩ জন, সেখানে ১০ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ হতে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এবারে (২০১৮ সালে) হজে যাচ্ছেন ১ লক্ষ ২৭ হাজার ১৯৮ জন, প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। জনগণের আর্থিক সক্ষমতা না বাড়লে এটি সম্ভব হতো না। মোট হজ যাত্রীর প্রায় ৮০% গ্রামের মানুষ। হজ করে ফিরে আসলে শুধু যে পুণ্য কামাই-ই হবে -তা নয়, গ্রাম-বাংলায় হজ ফেরত লোকজনের সামাজিক মর্যাদারও বৃদ্ধি ঘটে। এক সময়ে যখন ইস্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়নি, হয়নি ট্রেন-বাস-ইঞ্জিন চালিত জাহাজ আবিষ্কার, তখনকার মানুষ পায়ে হেঁটে, উঠের পিঠে চড়ে বা পালতোলা নৌকায় পবিত্র হজে গমন করত। এখন আর সে দিন নেই। এখন বিমানে ৬/৭ ঘণ্টায় বাঙালি হজযাত্রী ঢাকা হতে সরাসরি জেদ্দায় পৌঁছায়।

আগের দিনে হজে গমনাগমন বিড়ম্বনাপূর্ণ-কষ্টদায়ক ছিল—সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু এখন এ ডিজিটাল যুগে হজে গমন বিড়ম্বনাপূর্ণ হবে কেন? সেটিই প্রশ্ন। প্রতিবছর হজ মওসুমে পত্রিকার পাতা জুড়ে থাকে হজ যাত্রীদের কষ্ট ও বিড়ম্বনার করুণ চিত্র। টেলিভিশনগুলোর পর্দা জুড়ে থাকে অসহনীয় এ দুঃখ-কষ্ট-বিড়ম্বনার ধারাবাহিক সচিত্র বিবরণি। বিমান বিলম্ব, বিমান নষ্ট, হজ এজেন্টদের প্রতারণা, হজ ক্যাম্পের দুর্ভোগ, বিমানবন্দরে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবস্থান-সব মিলিয়ে হজযাত্রী ও তার পরিবার-স্বজনের সে কী দুর্ভোগ ও যন্ত্রণা! এ দুর্ভোগের অবসান হওয়া প্রয়োজন। খুঁজে বের করতে হবে-কেন এ দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়? কেন হজ অফিস, ধর্ম মন্ত্রণালয়, বিমান মন্ত্রণালয়, এয়ারপোর্ট অথরিটি, সিভিল এভিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত ব্যর্থতার পরে সমস্যার জট খুলতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়? আমরা এ অবস্থা আর দেখতে চাই না।

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান/বিভাগ/মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব দায়ভার আছে। তারা সঠিক, সুচিন্তিত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাই হজ সংক্রান্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত পূর্বাহ্নে গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অসত্ হজ এজেন্সিগুলোকে পূর্বাহ্নে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার গতবারের হজে হাজীদের নানা অভিযোগ তদন্ত করে ২৭টি হজ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে। আরোও ৩৫টি এজেন্সসিকে বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে। হজ সংক্রান্ত কার্যক্রমে কোনো অবহেলা, গাফিলতি, অনিয়ম বিন্দুমাত্র বরদাশত করা যাবে না। গতবার কিছু সংখ্যক হজ এজেন্সির মোয়াল্লেম ফি পরিশোধ না করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিমান ও সৌদিয়ার ৩০টি হজ ফ্লাইট বাতিল করতে হয়। পরবর্তীতে এইসব ফ্লাইটের যাত্রীদের বিশেষ ব্যবস্থাধীনে হজে পাঠানো হয়। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। তাই এবার কোনভাবেই যেন একটি হজ্জ ফ্লাইটও বাতিল না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশের হজ যাত্রীগণ কেবলমাত্র বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদি এয়ারলাইন্স ‘সাউদিয়া’ যোগে হজে যাওয়া-আসা করতে পারেন। এর ফলে হজ যাত্রীগণ এ দুটি বিমান সংস্থার কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েন। সাধারণ সময়ে যে ভাড়ায় ঢাকা-জেদ্দা যাওয়া যায়-হজের মওসুমে তা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। হজ নীতিমালার এই অযৌক্তিক শর্তের বিরুদ্ধে কতিপয় হজ এজেন্ট ২০১৩ সালে এ অযৌক্তিক ধারা বাতিল এবং হজ যাত্রী পারাপারে তৃতীয় বিমান সংস্থাকে (Third Carrier) কে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সালে মহামান্য হাইকোর্ট উক্ত ধারা বাতিল পূর্বক তৃতীয় বিমান সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার আদেশ প্রদান করেন। সরকার মহামান্য হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ ৪/১২/২০১৬ তারিখে আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। তা সত্ত্বেও এক অজ্ঞাত কারণে ২০১৭ সালের হজ যাত্রী পারাপারে তৃতীয় বিমান সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে গতবারে হজ যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

অতএব, ২০১৮ সালের অনুষ্ঠিতব্য হজের পূর্বেই বিমান-এর হজ যাত্রী পরিবহনের কোটায় অবশ্যই ‘জাতীয় হজ ও ওমরাহ’ নীতিমালায় ১০.১.১ ধারা অনুসরণ করতে হবে। যাতে বলা হয়েছে—‘হজ যাত্রী পরিবহনের সুবিধার্থে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদি এয়ারলাইন্স ছাড়াও ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা, ঢাকা-মদিনা-জেদ্দা-ঢাকা পথে সরাসরি হজ যাত্রী পরিবহনে ইচ্ছুক মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সুনামের অধিকারী প্রতিষ্ঠিত অন্য এয়ারলাইন্স যোগে হজ যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে’।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা জনাব শাহজাহান কামাল এম.পি। একজন সফল সংগঠক হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে। আশা করি ২০১৮ সালের হজ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দেবেন। হজ যাত্রীরা ‘মহান আল্লাহর মেহমান’। আর মহান আল্লাহর মেহমানদের কী পরিমাণ সম্মান, শ্রদ্ধা ও যত্ন নিতে হবে, আশা করি ৯০% মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের তা শিখিয়ে দিতে হবে না। মোবারক হোক-হজ-২০১৮।

n লেখক :সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ মার্চ, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৬
যোহর১২:০৯
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:০৯
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৬:০৪
পড়ুন