নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে
মীর আব্দুল আলীম০৫ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে
সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অগ্রগতি বড় ভূমিকা রাখলেও নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি। ঘরেবাইরে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশের ৬৫ শতাংশ বিবাহিত নারী নিজগৃহেই শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, ৩৫ শতাংশ অন্য কারো দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থার পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, গত তিন বছরে ১৫ বছরের কম বয়সী কিশোরীরা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসময়ে আক্রান্ত কিশোরীদের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ৪৩ শতাংশের ওপর ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। ২৭ শতাংশ নারী স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। নারী নির্যাতনের শিকার হয় কিন্তু বিচার হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী নির্যাতন বাড়ছে। দেশে কিন্তু নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন আছে; প্রয়োগ নেই। রয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।  তা সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না নারী নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণ।

পত্রিকায় দেখলাম, ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে যৌতুকের দাবিতে মাহফুজা খাতুন (৩০) নামে এক গৃহবধূকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করেছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশে এ জাতীয় নারী নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির ঘটনা মাত্রাতিরিক্তহারে বেড়ে গেছে। নিত্যই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। নির্যাতিত হচ্ছে স্কুলছাত্রী, রোগী, শিশু ও গৃহবধূ সহ নানাবয়সী নারীরা। নিজ গৃহে, হাসপাতালে, রাস্তাঘাটে, চলন্ত বাসে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গৃহে ঘটছে এই নির্যাতনের পৈশাচিক ঘটনা। নারী নির্যাতন করছে স্বামী, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাক্তার, কর্মচারী, পুলিশ, আত্মীয়, চাচা-মামা-খালু। কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ নয়। যৌতুকের জন্য স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতন, পথে-ঘাটে যৌন হয়রানি, ধর্ষণের পর খুন হচ্ছে নারী। এ ক্ষেত্রে থাকছে না বয়স, স্থান, কাল, পাত্রের ভেদ। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে নির্যাতন ও যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটছে। শুধু ধর্ষণই নয়, রীতিমতো গণধর্ষণ হচ্ছে। অপসংস্কৃতি আর ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের সমাজকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করছে তা হাল-আমলের ধর্ষণের চিত্র দেখলেই বেশ টের পাওয়া যায়। বাসের ভেতরে ধর্ষিত হচ্ছে মেয়েরা, শিক্ষাঙ্গনে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, এই হলো বাস্তবতা। তবে এটি নতুন কোনো বিষয় তা নয়; বলা যায় আমাদের সমাজ বাস্তবতার এক করুণ চিত্র। অপরাধের সাজা না হলে এ জাতীয় অপরাধ বাড়বে। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তবেই নারী নির্যাতন কমবে।

আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি প্রদান বেশ কঠিন। সবকিছুতেই আজ দখলদারী চলে। আর তাতে কিছু মানুষ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। নারী নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। নারীর ওপর বল প্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটতে পারে। কখনো দেখা যায়, সামাজিকভাবে কোণঠাসা কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার আশায় অলীক কল্পনা করতে থাকে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমাধান না পেয়ে, বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন, নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে তার উপর যেকোনো ধরনের আগ্রাসী যৌন আচরণ ক্ষমতা প্রদর্শনের, দমন-পীড়নের, কর্তৃত্ব করার কুিসত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যার জন্ম, সচেতন চেষ্টা ছাড়া নারীবান্ধব সে কোনোভাবেই হয়ে উঠতে পারে না। দৃষ্টিভঙ্গিটা পুরুষতান্ত্রিক বলেই নারীকে তারা গণ্য করে অধঃস্তন লৈঙ্গিক পরিচয়ের বস্তু হিসেবে যা পীড়নযোগ্য। এটা খুবই আশঙ্কার কথা যে, একজন মেয়ের জন্য সমাজের কেউই নিরাপদ নয়। যারা উচ্চবিত্ত, সমাজের ওপরতলার মানুষ, এই জাতীয় বিপদ তাদের ছুঁতে পারে কম। এদেশে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরাই বেশি। যারা নিম্নবর্গের বাসিন্দা, তারা সম্ভবত এখনো ধর্ষণকে স্বাভাবিক জ্ঞান করেন। ভয়ে চুপ থাকেন। ইজ্জত হারিয়েও মুখ খোলেন না। তারা জানেন আইন আদালত করলে তাদের ভাগ্যে উল্টো বিপত্তি ঘটবে। অন্যায় করে অপরাধীরা এভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই দেশে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ বেড়ে গেছে।

নারীর প্রতি অবিচার, নির্যাতন, যৌন-ব্যভিচার সর্বযুগে, সর্বধর্মমতে নিন্দনীয় নিকৃষ্ট পাপাচার। ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার চূড়ান্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা হলে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণে নিশ্চিত হলে হত্যাকারীর শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু  আমাদের দেশে এ যাবত্ যতগুলো ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার যথাযথ বিচার সম্পন্ন হয়েছে এরূপ নজির কমই আছে। আলোচিত নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো চাপা পড়ে যায় একসময়। হয় চূড়ান্ত রিপোর্টে ঘাপলা নয়তো সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রভাবিত করে অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে ঠিকই। উপরন্তু এর বিচার চাইতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীরা নির্বিচারে পাল্টা হত্যার হুমকি— কখনো কখনো হত্যার শিকার ও হয়রানির শিকার হন। এ অবস্থা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। নির্যাতনের ভয়াবহতা থেকে নারীকে বাঁচানোর উপায় কী? কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগেই কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা। আর এটা করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থানে থেকে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-মক্তব-মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সোচ্চার হতে হবে। সমাজের অন্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি কঠোর শাস্তির বিধান ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মর্যাদার আসনে বসাতে হবে।

n লেখক: গবেষক


 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৫ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩০
যোহর১২:০২
আসর৪:৩০
মাগরিব৬:১৯
এশা৭:৩২
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৬:১৪
পড়ুন