শিক্ষার্থী চাই পরীক্ষার্থী নয়
শাহজাহান আলী মূসা০১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
২০১০ সালে শিক্ষানীতি ঘোষণার সময় বলা হয়েছিল যে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমবে। কিন্তু আদতে দেখা গেল—শিক্ষার্থীদের ওপর আরো পরীক্ষা ও বইয়ের চাপ বেড়েছে। তাতে নোটবই গাইডবই বিক্রেতাদেরই উপকার করা হলো, শিক্ষার্থীদের নয়। বলা হলো শুধু প্রাথমিক লেভেলে পরীক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণিতে আর মাধ্যমিক লেভেলের পরীক্ষা হবে দ্বাদশ শ্রেণিতে। কিন্তু কী এক অজানা কারণে তা আটকে গেল। আর এর ওপর আবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা ব্যবস্থা। অর্থাত্ শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষার চাপ বেশি। শুধু পরীক্ষার চাপই নয়, বেড়েছে বইয়ের চাপও। নতুন নতুন বই যুক্ত হয়েছে, যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সিলেবাস, যা শিশুর মানসিক বিকাশ তো দূরে থাক—পরীক্ষা ও বইয়ের চাপে নুয়ে পড়ছে আজকের শিশু। শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেসব বই অন্য বইয়ের সঙ্গে দু’একটা অধ্যায় যুক্ত করলেই যথেষ্ট। যেমন ক্যারিয়ার, জীবন ও স্বাস্থ্য, কম্পিউটার, তথ্য ও প্রযুক্তি, মজার পড়া ইত্যাদি বই। ক্যারিয়ার নামক বইটি বাংলা বইয়ে, জীবন ও স্বাস্থ্য নামক বইটি সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ে, তথ্য ও প্রযুক্তি নামক বইটি কম্পিউটার বইয়ে যুক্ত করা যায়। তাতে বইয়ের চাপ কমবে।

সৃজনশীল শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে শিশুদের সৃজনশীলতা বাড়ানোর কথা বলে। কিন্তু সেই সৃজনশীলতা তো বাড়ছেই না বরং কমছে। কারণ শিশুরা বই পড়া কমিয়ে দিয়েছে। কারণ প্রশ্নপত্রে প্রশ্ন ও উত্তর দুটোই দেওয়া থাকে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে যে কীভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় তার কোনো সঠিক পদ্ধতি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জানা নাই। যদিও মন্ত্রণালয় বলছে শিক্ষকদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠে গিয়ে দেখা যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার খুবই নগণ্য। তাঁরাও ঠিকমতো বুঝেছে কি না সন্দেহ। তাই তো শিক্ষকরাও নোট-গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা নোট-গাইড বই দেখে প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। ২১ নভেম্বর ২০১৬-তে দৈনিক ইত্তেফাক ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একাডেমিক সুপারভিশন’-এর রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রণয়নের দীর্ঘ ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিই বোঝেন না।

আনন্দের মাধ্যমে যে শিক্ষা অর্জন করতে হয় তা শিশুরা একরকম ভুলেই গেছে। তার মধ্যে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে গেলে শিশুদের দিতে হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষা। শিশুকে যদি শিশুশ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েই ভর্তি হতে হয় তবে সে কোথা থেকে শিক্ষা অর্জন করবে? শিশুরা কি বাসায় লেখাপড়া শিখে তারপর স্কুলে খেলাপড়া শিখতে যাবে? নাকি শিক্ষা অর্জন করার জন্য শিশু স্কুলে যাবে? আজকের শিশুকে শিখতে গিয়েই পরীক্ষা দিতে হয়। এটা কোন ধরনের শিক্ষানীতি?

আবার ওপর থেকে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ থাকে যে ফলাফল ভালো দেখাতে হবে, অল্প সময়ের মধ্যে খাতা দেখা, ফলাফল দেওয়া, এত পারসেন্ট পাস দেখাতে হবে ইত্যাদি। তা না হলে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি। তাই প্রতিষ্ঠান তথা শিক্ষকসমাজ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে। এসব নানাবিধ কারণে শিক্ষাক্ষেত্র এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা। তাই বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যায়—আসলে জিপিএ-৫ পাওয়াকেই বড় করে দেখা হচ্ছে। অধিকাংশ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীই মৌলিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা আজ শিক্ষার্থীর চেয়ে পরীক্ষার্থী হয়ে পড়ছে।

শিক্ষার যতগুলো স্তর রয়েছে তার মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ও মাধ্যমিক শিক্ষাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। আর তাই প্রাথমিকে গলদ রেখে উচ্চশিক্ষা লাভ সহজতর হবে না। সে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

সরকারি বাঙলা কলেজ

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:২১
যোহর১২:১৩
আসর৪:০৯
মাগরিব৫:৪৮
এশা৭:০৩
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:৪৩
পড়ুন