কয়েদির কারাযন্ত্রণা :অধিকার তাদেরও আছে...
১১ অক্টোবর, ২০১৭ ইং
কয়েদির কারাযন্ত্রণা :অধিকার তাদেরও আছে...
লুত্ফুন্নাহার নাবিলা

গত বছর একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘Nothing is free in jail’; সহজ বাংলায় বললে কারাগারে কোনো কিছুই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না!

সাধারণত জেলগুলো জেল কোডের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কারাগার আইন ১৮৯৪, কারাবন্দি আইন ১৯০০ এবং কারাবন্দি আইন ১৯২০ নিয়ে জেল কোড গঠিত হয়েছে এবং এই কোড অনুসারে জেল কার্যক্রম পালন করা হয়। যদিও দেওয়ানি মামলা সম্পর্কিত বিষয়ে কেউ জেলে গেলে তাকে জেলখানায় থাকা ও খাওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়, কিন্তু পুরো জেল কোড ঘেঁটেও একজন দেওয়ানি মামলার আসামিকে জেলে থাকার জন্য কত টাকা দিতে হয় তা পেলাম না। আদতে এসব কয়েদির থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা পুরোপুরি রাষ্ট্রকে নিতে হয়। অথচ আমাদের দেশে এই ক্ষেত্রেও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ আছে।

সাধারণত আমরা মনে করি যে যেহেতু একজন ব্যক্তি অপরাধ করেছে তার জন্য মৌলিক অধিকারগুলো শিথিল হয়ে যায়। আসলে এই ধারণা ভুল। বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া একজন ব্যক্তি কোনো অপরাধ করলেও তার আর পাঁচজনের মতো অধিকার রয়েছে। জেল কোডের ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে যে মেডিক্যাল অফিসার খাদ্যগুদাম এবং রান্নাঘর পরিদর্শন করবেন এবং রান্নার জন্য ব্যবহূত পাত্র পরিষ্কার আছে কি না তা দেখবেন এবং রান্নার জন্য উপকরণ এবং সবজি পরিষ্কার এবং মানসম্পন্ন কি না এবং পরিমাণে পর্যাপ্ত কি না তা দেখবেন। ধারা ১২৮-এ পানির উত্স এবং ১২৯-এ কয়েদিদের স্যানিটেশন পরিষ্কার আছে কি না তা দেখতে হবে। অথচ আমাদের দেশের জেল অফিসাররা যেন এসব দেখার সময়ই পান না।

বাংলাদেশে মোট জেলের সংখ্যা ৬৮টি এবং জরিপমতে এসব জেলের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ২৫ হাজার; কিন্তু এসব জেলে ৬০ হাজারের বেশি কয়েদি রাখা হয়েছে, যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি। ফলে কয়েদিদের পালাক্রমে ঘুমাতে হয় এবং জেল কোড অনুযায়ী যেখানে প্রত্যেক কয়েদির ৩৬ বর্গফুট জায়গা পাওয়ার কথা  সেখানে তিন ভাগের এক ভাগও মেলে না। এবং সেলগুলো এতই ছোট এবং তাতে আলো বাতাস আসার জায়গা এতই কম যে সেখানে নিঃশ্বাস নেওয়ার জো নেই।

কারা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম দুর্নীতি যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। কয়েদিদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার এবং কাপড় তাদের হাতে আদৌ পৌঁছায় কি না কে জানে। যে কোনো সুবিধার জন্য কয়েদিদের বাড়তি টাকা দিতে হয়। টাকার ভিত্তিতে বৈষম্য চলে—যেমন যে টাকা দিতে পারে সে সুযোগ-সুবিধা পায় এবং না দিতে পারলে তাকে  নোংরা খাবারই মুখে তুলতে হয়। আবার টাকার বিনিময়ে সিগারেট, মাদক পাওয়া যায় এসব জেলখানায়।

জেল কোডের  ৩৬ ধারা অনুযায়ী জেনারেল অব প্রিজনের (আইজি-প্রিজন) প্রতিবছর কমপক্ষে একবার কেন্দ্রীয়  জেলখানা এবং অন্ততপক্ষে প্রতি দুই বছরে একবার জেলা কারাগারগুলো পরিদর্শন করার কথা বলা হয়েছে।  জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার জেলা কারাগার পরিদর্শন করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া জেল কোডের ৫৫ ধারা অনুযায়ী সরকার জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিভাগীয় কমিশনার,  জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা জজ, সিভিল সার্জন এবং জেলা স্কুল পরিদর্শক মহোদয়ের সমন্বয়ে জেলখানা পরিদর্শক দল গঠন করবেন, যাঁদের নিয়মিত জেলখানা পরিদর্শন করার কথা বলা হয়েছে। সবার উচিত তাদের সাহায্য করা, তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়া। কারণ অধিকার  যেমন আমাদের রয়েছে, তাদেরও রয়েছে—তা থেকে আমরা যেন তাদের বঞ্চিত না করি। তারা যেন সুন্দর জীবন ফিরে পায় সেই দায়ভার রাষ্ট্র এবং জনগণ সবার।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৯
যোহর১১:৪৬
আসর৩:৫৮
মাগরিব৫:৪০
এশা৬:৫১
সূর্যোদয় - ৫:৫৪সূর্যাস্ত - ০৫:৩৫
পড়ুন