বিভিন্ন ভাষাভাষী তরুণদের মাতৃভাষা নিয়ে ভাবনা
২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
বিভিন্ন ভাষাভাষী তরুণদের মাতৃভাষা নিয়ে ভাবনা

 

মায়ের ভাষায় কথা বলার মজাই আলাদা। ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য রাজপথে নেমেছিলেন বাঙালি তরুণ যুবারা। আর এই মাতৃভাষা নিয়ে কী ভাবছে তরুণেরা? বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষাভাষী তরুণ-তরুণীদের কাছে তাই জানতে চেয়েছেন

ছাইফুল ইসলাম মাছুম

‘আমি বাংলায় কথা বলতে পারি’

—উগেন শ্রীরিং, ভুটান

 

ভুটানের নাগরিক উগেন শ্রীরিং। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। উগেনের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায়। তিনি ও তার বন্ধুরা একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে শহীদ মিনারে রঙের কাজ করছিলেন। উগেন শ্রীরিং জানান, প্রথম যখন স্কলারশিপ নিয়ে বাংলাদেশে পড়তে আসি। তখন বাংলায় কথা বলতে পারতাম না। এখন চর্চা করতে করতে বাংলায় কথা বলতে পারি। বাংলা ভাষার যে আত্মত্যাগের ইতিহাস আছে, তা অন্য জাতির নেই। বাংলা ভাষায় কথা বলতে পেরে আমি গর্ববোধ করছি। বাংলা ভাষার সবচেয়ে রোমান্টিক ও মজার বাক্য, ‘আমি তোমায় ভালোবাসি।’ তিনি জানান, নিজের দেশ ভুটানে গেলে তিনি মাতৃভাষা জংখায় কথা বলেন।

‘মাতৃভাষা চাকমাতে কথা বলতে পারি, অথচ লিখতে পারি না’

—সমুজ্জল চাকমা, চাকমা জনগোষ্ঠী, খাগড়াছড়ি

 

সমুজ্জল চাকমা বেড়ে উঠেছেন খাগড়াছড়িতে। তিনি বর্তমানে বুয়েটে ত্রিফলীর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। বুয়েট ক্যান্টিনে কথা হয় সমুজ্জল চাকমার সঙ্গে। তিনি জানান, পারিবারিক পরিবেশে চাকমা ভাষায় কথা বললেও ছোটবেলা থেকে পড়ালেখা করে আসছেন বাংলা ভাষায়। তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের মাতৃভাষা চাকমাতে কথা বলতে পারি, অথচ লিখতে পারি না। এই লজ্জা আমাদের যেমন আছে, এ লজ্জা রাষ্ট্রেরও। কারণ আমি আমার মাতৃভাষায় পড়ালেখা করার সুযোগ পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, ঠিক তেমন অন্য ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষার প্রতি সম্মানবোধ তৈরি করতে ভূমিকা রাখে।’

‘অনেক মাতৃভাষা হারিয়ে যাবে’

—জাডিল মৃ, গারো জনগোষ্ঠী, টাঙ্গাইল

 

গারো জনগোষ্ঠীর একজন জাডিল মৃ, জন্ম ও বেড়ে ওঠা মধুপর টাঙ্গাইলে। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, বাংলাদেশ বহু জাতি বহু ভাষার এক মিলনস্থল। শিক্ষা যেমন আমাদের মৌলিক অধিকার, ঠিক তেমনি নিজের মাতৃভাষায় লেখাপড়া করাও আমাদের অধিকার। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় অচেনা এক ভাষা দিয়ে, যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যে দেশে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিল, সেই দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মাতৃভাষার সমৃদ্ধির জন্য তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই, যা খুবই দুঃখজনক। বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির জন্য যেমন বাংলা একাডেমি আছে, তেমনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মাতৃভাষার বিকাশে সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, যেখানে দেশের সমস্ত ভাষা নিয়ে গবেষণা হবে এবং তা সংরক্ষিত হবে। যদিও পাঁচটি জাতিগোষ্ঠীর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছে, আমরা বলতে পারি না এটা পর্যাপ্ত, কারণ এখনো অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী বাদ পড়ে আছে। এমনভাবে চলতে থাকলে আস্তে আস্তে অনেক মাতৃভাষা হারিয়ে যাবে। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ খুব তাড়াতাড়ি এ সমস্যার সমাধান করবে।’

‘বাংলা আবার শুদ্ধভাবে আমাদের হয়ে উঠুক’

—শেখ কান্তা রেজা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী শেখ কান্তা রেজা। তিনি বলেন, ‘উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেব না বলে রক্তে রাস্তা ভিজিয়ে যে বাংলাকে আমরা আমাদের করে নিয়েছিলাম, সেই বাংলার উপরে কিছুটা ইংরেজির আস্তরণ পড়ছে আজকাল। একুশ মানে বেশ কিছু ব্র্যান্ডের পোয়াবারো, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মানে যেন ফেসবুকে ‘আমি কি ভুলিতে পারি’! আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সমস্যা, আমরা বড্ড শিকড় ভুলে যাই। বাংলা ভাষায় কথা বলা আজকাল সেকেলে হওয়ার লক্ষণ বলে ধরা হয়। অথচ কী সাবলীলভাবে আমরা সমস্ত অনুভূতিগুলোকে শুধু বাংলাতেই তুলে ধরতে পারি! খুব করে চাই, বাংলা আবার শুদ্ধভাবে আমাদের হয়ে উঠুক, শুদ্ধ ও সঠিক বানানে, প্রমিত উচ্চারণে আমরা বাংলাকে কণ্ঠে ধারণ করি। আন্তর্জাতিকতার ভিড়ে আমাদের নিজস্বতা যেন বিলীন না হয়ে যায়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এটাই চাওয়া আমার।’ 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৬
যোহর১২:১২
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৬:২১সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
পড়ুন