আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন ইস্যুতে সমঝোতা
শ্রমিক নেতাদের কর্মসূচি স্থগিত
রিয়াদ হোসেন২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
গার্মেন্টস শিল্প অধ্যুষিত আশুলিয়ায় সাম্প্রতিক শ্রম অসন্তোষ ও এর জেরে সৃষ্ট মালিকপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের দূরত্ব দৃশ্যত কমে এসেছে। সরকারের উদ্যোগে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সমঝোতা হয়েছে। ফলে অ্যাপারেল সামিটের আগের দিন ‘অ্যাপারেল লেবার সামিট’ নামে একটি শ্রমিক সংগঠনের পাল্টা কর্মসূচি স্থাগিত করা হয়েছে। অ্যাপারেল সামিট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ওই কর্মসূচি পালন করা হবে। মঙ্গলবার রাতে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর সভাপতিত্বে এক বৈঠকে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) ওই কর্মসূচি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৈঠকে গার্মেন্টস মালিকপক্ষের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, অ্যাপারেল সামিটের আগের দিন শ্রমিকদের যে কর্মসূচি ছিল, সেটি তারা স্থগিত করেছে। পরে ওই কর্মসূচি পালন করবে। মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আশুলিয়া ইস্যুতে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সেটি এখন আর নেই। তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। উভয় পক্ষ একসাথে কাজ করবে।

বৈঠকে উপস্থিত একজন সিনিয়র শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ইত্তেফাককে বলেন, আশুলিয়া ইস্যুতে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি ছিল। সরকার ও মালিকপক্ষ এগুলো মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। এ কারণে আমাদের পূর্বনির্ধারিত ‘অ্যাপারেল লেবার সামিট’ কর্মসূচি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। অ্যাপারেল সামিট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এটি অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও বিজিএমইএ আমাদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, অ্যাপারেল সামিট উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগের দিন আমাদের কর্মসূচি পালন কিছুটা দৃৃষ্টিকটুও। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে তা স্থগিত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে আশুলিয়ার ঘটনায় করা সবকটি মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। সেই সঙ্গে আটক সব শ্রমিককে মুক্তি দেওয়া, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের অফিস খুলে দেওয়া, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক শ্রমিক নেতাদের হয়রানি বন্ধ করা, আশুলিয়ার ঘটনায় চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের কাজে ফেরত নেওয়া কিংবা তাদের যথাযথ পাওনাদি পরিশোধ করা, স্বাভাবিকভাবে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম চালু করার দাবি জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উভয়পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে যে সব শ্রমিক কিংবা শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, মামলা থেকে তাদের নাম প্রত্যাহারে সরকার ও মালিকপক্ষ সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া আশুলিয়া ইস্যুতে আটক ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়েছে। সরকার নিবন্ধিত শ্রমিক ফেডারেশনের একটি করে অফিস আশুলিয়া এলাকায় থাকতে পারবে। তবে অনিবন্ধিত বা কোনো এনজিওর (বেসরকারি সংস্থা) অফিস সেখানে থাকবে না। এসব বিষয়ে সরকার ও মালিকপক্ষ ও শ্রমিক নেতারা একমত হয়েছেন।

বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ ছাড়াও আইবিসির সভাপতি আমিরুল হক আমিন, মহাসচিব কুতুবউদ্দিন আহমেদ, রায় রমেশ চন্দ্র, বাবুল আখতার, নাজমা আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই কিংবা নিরীহ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু কেউ যদি ফৌজদারি অপরাধ করে থাকেন, তাদের বিষয়ে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হলে কেউ কথা বলতে পারবে না। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে তিনি বলেন, চাকরিচ্যুতি নয়, ওই ঘটনায় কিছু শ্রমিককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরে তদন্তকাজ চলা অবস্থায় তারাই শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে সমঝোতা করে চাকরি ছেড়ে পাওনা অর্থ নিয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে শ্রমিক নেতা রায় রমেশ চন্দ্র ইত্তেফাককে বলেন, গার্মেন্টস পণ্য গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের অংশ। এ জন্য মালিকপক্ষ, শ্রমিক ও সরকার— পরস্পর শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করা দরকার। মালিকপক্ষের ট্রেড ইউনিয়ন সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানা দরকার। শ্রমিক সংগঠনকেও দায়িত্বশীল আচরণ করা দরকার।

প্রসঙ্গত গত ১১ ডিসেম্বর আশুলিয়ায় হঠাত্ মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বেমানে ছড়িয়ে দেওয়া লিফলেটের ওপর ভর করে একটি কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। ধীরে ধীরে কর্মবিরতি অন্যান্য কারখানায়ও ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে এ কর্মবিরতি শুরু হয়। কারখানা মালিক, শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ও সরকারের একাধিক মন্ত্রী আলোচনা চালিয়েও ব্যর্থ হন। এভাবে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েন মালিকপক্ষ। ১৯ ডিসেম্বর নাগাদ কর্মবিরতির শিকার হওয়া কারখানা ৫০ ছাড়িয়ে যায়। এর পর হার্ডলাইনে যায় মালিক ও সরকারপক্ষ। শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। মামলা করা হয় দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক ও শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে। তাদের বেশিরভাগকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আটকও করা হয় ৩৪ জনকে। এর পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ শুরু হয় এ খাতের উদ্যোক্তা ও সরকারের ওপর। বিজিএমইএ’র উদ্যোগে আগামী শনিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) অ্যাপারেল সামিট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ সামিটকে সামনে রেখে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালাতে শুরু করে শ্রমিক নেতাদের একটি পক্ষ।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
পড়ুন