সাহিত্যের গোয়েন্দাগিরি
৩০ এপ্রিল, ২০১৬ ইং
সাহিত্যের গোয়েন্দাগিরি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এডগার অ্যালেন পো’র হাত ধরেই গোয়েন্দা কাহিনির সূচনা। সেই অ্যালেন পো থেকে শুরু করে স্যার আর্থার কোনান ডায়েলের শার্লক হোমস হয়ে গোয়েন্দা কাহিনির রেশ শুরু হলো আমাদের এই বাংলাতেও। যদিও এর প্রচলন বেশি দিনের নয়, তারপরও ‘ফেলুদা’, ‘কাকাবাবু’, ‘তিন গোয়েন্দা’ এই নামগুলোর সাথে আমরা অল্প দিনের মাঝেই পরিচিত হয়েছি। আর এ নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন-

8 মীর রায়হান মাসুদ

 

 

 

প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘দারোগার দফতর’

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের সূচনার প্রসঙ্গ এলেই অধিকাংশ মানুষ যে বইটির কথা বলেন তা হলো, ‘দারোগার দফতর’। এর লেখক ছিলেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। বহুকাল আগে ১৮৯২ সালের দিকে বইটি প্রকাশিত হয়। আর লেখক প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় নিজে পুলিশের ডিটেকটিভ বিভাগের কর্মচারী ছিলেন। ফলে এ সংক্রান্ত বিষয়ের একটা স্বচ্ছ ধারণা তার আগে থেকেই ছিল। মূলত, সে ধারণার স্ফুরণ ঘটেছে তার লেখায়। কিন্তু সাহিত্যমানের দিক থেকে তা অনেক পিছিয়ে ছিল।

 

 

জনপ্রিয় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ব্যোমকেশ

১৯৩৯ সালের দিকে যাত্রা শুরু হয় ‘ব্যোমকেশ বকসী’র। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই গোয়েন্দা ব্যোমকেশ তার যাত্রা শুরু করেন। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মধুর গোয়েন্দা বলা হয় ব্যোমকেশ বকসীকে। এ গোয়েন্দা চরিত্রটি ভারতীয় উপমহাদেশের পাঠকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। শরদিন্দুর মাঝে লেখার সবচেয়ে বড় যে গুণটি ছিল তা হলো, সহজ এবং সাবলীলতা। ভাষায় সাধু-চলিতের পার্থক্য খোঁজার কোনো সুযোগ পাঠকরা এখানে পাবেন না। যেন নতুন কোনো ভাষারীতি আর প্রাঞ্জলতার রেখা টেনেছেন তিনি। সংক্ষিপ্ত এবং সহজ ভাষার কারণে টানটান উত্তেজনাপূর্ণ গল্পগুলো খুব অল্প সময়ে পড়া হয়ে যায়। আর এসব কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যোমকেশ সিরিজটি সবার কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ব্যোমকেশ সিরিজের প্রথম গল্প ‘সত্যান্বেষী’। গোয়েন্দা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও নিজেকে কখনোই গোয়েন্দা ভাবেন না ব্যোমকেশ। গোয়েন্দা কথাটায় তার এক প্রকারের অ্যালার্জি রয়েছে। তিনি নিজেকে বলেন সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যোমকেশ চরিত্র নিয়ে ৩৩টি কাহিনি লিখেছেন। এর মধ্যে একটি রয়েছে অসম্পূর্ণ। এই ‘ব্যোমকেশ বকসী’কে নিয়ে কয়েকটি ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রও তৈরি করেছেন, যেখানে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘আবীর চ্যাটার্জী’।

 ‘ফেলুদা’র স্রষ্টা সত্যজিত্ রায়

ব্যোমকেশ বকশীর সাথে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে আসেন একজন, তিনি ‘ফেলুদা’। আর এর জনক ‘পথের পাঁচালী’র সত্যজিত্ রায়। খুব অল্প দিনের মধ্যেই বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনির পুরো মোড় ঘুরিয়ে দেয় এই ফেলুদা এবং তার পিসতুতো ভাই তোপসে ও লেখক জটায়ু! সত্যজিত্ রায়কেই বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধের গোয়েন্দা সাহিত্যের সেরা লেখক মানা হয়। তিনি মূলত লিখেছেন কিশোরদের জন্য, তবে বড়দের কাছেও এটি সমান জনপ্রিয়। জনপ্রিয় এ কাল্পনিক চরিত্রটির আসল নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র। তবে এ নাম ছাপিয়ে বছরের পর বছর ধরে বই-মঞ্চ আর সিনেমায় ফেলুদা নামেই এর রাজত্ব। এ চরিত্রটি প্রথম মানুষের সামনে আসে ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে। পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় পত্রিকা সন্দেশ-এর ডিসেম্বর সংখ্যায় সত্যজিত্ রায়ের লেখা ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ প্রকাশিত হয়। সেই শুরু। এরপর কেবল চরিত্রের জনপ্রিয়তা আর বিস্তৃতি বেড়েই চলেছে। কখন ও কমেনি। অধিকাংশ ফেলুদা কাহিনি প্রথম পূজা বার্ষিকী দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। অল্প কিছু কাহিনি প্রকাশিত হয়েছিল সন্দেশ পত্রিকায়। বইগুলোর বাঁধাই কপি প্রকাশিত হয়েছে আনন্দ প্রকাশনা থেকে। এ ছাড়া ফেলুদার ওপর কমিক স্ট্রিপও প্রকাশিত হয়েছে। অধিকাংশ ফেলুদা বইয়ের প্রচ্ছদ এবং অলঙ্করণ সত্যজিত্ রায়ের নিজের আঁকা। ফেলুদা সিরিজের সব গল্প ও উপন্যাস ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ফেলুদা সিরিজের ৩৫টি সম্পূর্ণ ও চারটি অসম্পূর্ণ গল্প-উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। ফেলুদা চরিত্রটির সঙ্গে অনেকেই স্যার আর্থার কোনান ডায়েলের শার্লক হোমসের মিল খুঁজে পাবেন! আর হ্যাঁ, ফেলুদার কথা যখন বলাই হলো তখন কিন্তু অভিনেতা ‘সব্যসাচী’র কথা না বললেই নয়। কেননা, বছরের পর বছর এই অভিনেতাকেই আমরা সত্যিকারের ফেলুদা ভেবে আসছি!

 

 

তিন গোয়েন্দার রকিব হাসান

বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র খুব কমই রয়েছে। বিশেষত, বাংলাদেশে গোয়েন্দা সাহিত্যে হাতে গোনা দু’একটি গোয়েন্দা চরিত্র পাঠকের হূদয় ছুঁয়ে আছে। আর এ রকমই একটি সিরিজ ‘তিন গোয়েন্দা’। কম করে হলেও তিনটি প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় এক সিরিজ এটি। কিশোর-মুসা-রবিন নাম তিনটির সঙ্গে বাংলাদেশের কোটি কিশোর-কিশোরীর সব দুরন্ত দিনের রয়েছে এক মেলবন্ধন। শিশু-কিশোরদের সামনে নতুন এক পৃথিবী তৈরি করেছে কিশোর, মুসা আর রবিনরা। তিন গোয়েন্দার সঙ্গে একটির পর একটি জটিল রহস্যের জাল ছিন্ন করার অভিজ্ঞতা যে কাউকেই মুগ্ধ করে। এ তিন গোয়েন্দার সঙ্গে ঘরে বসেই বেড়িয়ে আসা যায় আমাজনের জঙ্গল কিংবা দুর্গম পাহাড়ের কোলে। অদ্ভুত রহস্যময়তার সেই জগত্ এ দেশের শিশু-কিশোরদের বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম মোহিত করে রেখেছে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে একটি গোয়েন্দা সিরিজ, অথচ তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এতোটুকুও! ইতিহাসের বিরল ঘটনা বটে। এ ঘটনাটির কেন্দ্রে যিনি, তিনিই রকিব হাসান। বাংলাদেশের সাহিত্যে ‘তিন গোয়েন্দা’ লিখে যিনি কাটিয়ে দিয়েছেন ২৫-২৬ বছর। স্বনামে-বেনামে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাড়ে চারশ’র ওপরে। কিন্তু মিডিয়া কিংবা বইয়ের ভাণ্ডার সব জায়গাতেই নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন তিনি। কখনও কোথাও কোনো ছবি ছাপতে দেননি। সবাই তার নাম ও তিন গোয়েন্দাকে চেনে। কিন্তু এরপরও তিন গোয়েন্দার জনক মানুষের সামনে আসতে চান না। চান না কোথাও তার ছবি ছাপা হোক। সাধারণ মানুষের মতো সাধারণের ভিড়ে মিশে থাকার জন্যই নিজেকে সব সময় আড়াল করে রেখেছেন তিনি। আর তিন গোয়েন্দা! আমাদের কৈশোর পেরিয়ে গেলেও তিন গোয়েন্দা কিন্তু এখনও কিশোরই রয়ে গেছে! 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন