নজরুলের বাল্য বিদ্যাপীঠ
২৬ মে, ২০১৮ ইং
নজরুলের বাল্য বিদ্যাপীঠ
8 ফারুক আহমেদ, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)

 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার জীবনের খণ্ডকালীন সময় কাটিয়েছেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায়। তিনি এই এলাকায় থাকাকালীন সময়ে তত্কালীন দরিরামপুর স্কুলে দু-বছর লেখাপড়া করেছেন।

১৯১৩ সালে ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর গ্রামের কিছুসংখ্যক শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি জাতীয় কবির এ বিদ্যাপীঠটি প্রতিষ্ঠা করেন । যাদের মধ্যে হাজি মেহের আলী মৃধা অন্যতম। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান বাবু বিপিং চন্দ্র চাকলাদার। তখন বিদ্যালয়টি কলকাতার অধীন ছিল। কতটুকু জমিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা জানা না গেলেও বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের ৬ একরের বেশি  জমি রয়েছে।

১৯১৪ সালে ত্রিশালের কাজী শিমলা গ্রামের দারোগা রফিজ উল্লাহ কবি নজরুলকে তত্কালীন দরিরামপুর হাই স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করান। তখন এটি ছিল টিনশেড ঘর । বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ত্রিশালে কবি নজরুলের স্মৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তারা এই বিষয়টি নিশ্চিত করে ছিলেন যে, কবি নজরুল এখানে ১৯১৪ সালে অবস্থান করে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৮ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করেছেন, কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষা দেননি।

দরিরামপুর গ্রামের নিয়ামত আলী কবি নজরুলের শ্রেণিবন্ধু ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দরিরামপুর হাই স্কুলের শিক্ষকতা করেন। নিয়ামত আলীর ছাত্র এবং এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন স্থানীয় এএসএম আব্দুল করিম। তিনি নজরুলের ত্রিশালে অবস্থানকালীন সময়ে স্মৃতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিয়ামত আলী স্যার কবি নজরুল সর্ম্পকে তেমন একটা বলেননি। তিনি দাবি করেন, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে এবং ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষক হিসেবে নজরুলকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ ও লোকজন যারা নজরুলের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাদের বক্তব্য থেকে জেনেছি, নজরুল ইসলাম এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়াকালীন সময় থেকেই কবিতা লিখতেন। নজরুলকে খিদির পণ্ডিত নামের একজন শিক্ষক খুবই স্নেহ করতেন। নজরুলের একটি বাঁশি ও খাতা ছিল, যা তিনি কাউকে দিতেন না। কিন্তু খিদির পণ্ডিত প্রায়ই এই খাতা দেখতেন এবং সংশোধন করে দিতেন বলে শুনেছি। যার সুবাদে খিদির পণ্ডিতের সাথে নজরুলের যোগসূত্র ছিল খুবই ঘনিষ্ট। তত্কালীন দরিরামপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবু বিপিন চাকলাদার খুবই দায়িত্বশীল শিক্ষক ছিলেন। তিনি পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের ছাত্রদের বাড়িতে পাঠাতেন এবং প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রতিবেদন খাতায় মন্তব্য লিখতেন। একদিন জানতে পারেন স্কুলে যাওয়ার পথে শুকনী বিলে পানি হওয়ায় নজরুল স্কুলে আসতে পারছে না। নজরুলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষক খিদির উদ্দিন পণ্ডিত নজরুলকে বীররামপুরে নিয়ে আসেন। এখানে থেকে নজরুল কিছুদিন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। নজরুলের কিশোর জীবনে গানের শিক্ষক ছিল এই স্কুলের শিক্ষক মহিম চন্দ্র খাস নবীস। তিনি নজরুলকে গান শেখাতেন। নজরুল গানে প্রথম তালিম নেন তার কাছ থেকে। এই স্কুলে কবির ফার্সি শিক্ষক ছিলেন মোহাম্মদ আলী। তার কাছ থেকে তিনি ফার্সি ভাষা শেখেন। প্রিয় শিক্ষক খিদির উদ্দিন পণ্ডিত মোহাম্মদ আলীর বিদায় অনুষ্ঠানে নজরুল কবিতা আবৃত্তি করেন। তাদের বিদায়ের পরদিন থেকে নজরুল নিখোঁজ হন। নজরুল নিখোঁজ হওয়ার পর স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপিং চাকলাদার ও মহীম বাবু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও নজরুলের সন্ধান পাননি।’

 

নজরুলের স্মৃতির সাক্ষী হয়ে এই বিদ্যালয়টি যুগযুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চলতি স্কুলটি শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। স্কুলটি শুরু থেকে ভালো পড়াশোনা ও ভালো ফলাফলের কৃতিত্বের কারণে এবং জাতীয় কবিকে লালনের জন্য দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ১৯৬৪ সালে এটি নাম পরিবর্তন করে নজরুল একাডেমি নাম ধারণ করেছে। কবি জীবিত থাকা অবস্থায় ও জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই ১৯৬৫ সাল থেকে এই বিদ্যালয় মাঠে জাঁকজমকভাবে নজরুল জন্মজয়ন্তী পালন শুরু হয়। নজরুল স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও স্কুলটি তার সুনাম ধরে রাখে। উপজেলার মোক্ষপুর গ্রামের একজন হিন্দু ছেলে কলকাতা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নেয়। পরে অবশ্য সে কলকাতা চলে যায়। এছাড়াও পরে একজন বোর্ডে মেধা তালিকায় ১০ম স্থান লাভ করে। ১৯৬৫ সালে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক পিএ নাজির ত্রিশালে নজরুল জন্মজয়ন্তীর সূচনা করেন। সেসময় ময়মনসিংহ সদর ও ত্রিশাল অংশের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমরা ১৯৬৪ সালে স্কুলের নাম পরিবর্তন করে নজরুল একাডেমি করি। ১৯৯০ সালে এই স্কুল মাঠে রাষ্ট্রীয়ভাবে জন্মজয়ন্তী পালন শুরু হয়। তত্কালীন রাষ্টপতি এইচএম এরশাদ তিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। মূল্যায়ন শুরু হয় নজরুলের স্মৃতির প্রতি। এরশাদ নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত দরিরামপুর হাই স্কুলকে সরকারিকরণের ঘোষণা দেয়। কিন্তু ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন হওয়ায় এটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৯১ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই স্কুলটি আবার সরকারিকরণের ঘোষণা দেন। কিন্তু তা আবারো বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল হক আবারো এটি সরকারিকরণের ঘোষণা দিলেও তা আজো আলোর মুখ দেখেনি।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেছবাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমার কাছে কবি নজরুল সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই, এমনকি বিদ্যালযের রেকর্ডও নেই। লোকমুখে প্রাপ্ত তথ্যই স্কুলের অতীত ইতিহাস। কবি নজরুলের ব্যবহূত এবং যে ক্লাসে বসে ক্লাস করেছেন সেই কক্ষ দুটি অবশ্য সংরক্ষিত আছে। এটি কবি নজরুলের দরিরামপুর হাইস্কুলে একমাত্র সাক্ষী। যুগ যুগ ধরে এটি নজরুলের স্মৃতি বহন করবে। কিন্তু কবির স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর জন্য এ স্কুলটি জাতীয়করণের দাবি এলাকাবাসীর। শুধু তাই নয়, জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানটির সামনে নজরুলের কিশোর বয়সের ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৬ মে, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৪১
এশা৮:০৪
সূর্যোদয় - ৫:১৩সূর্যাস্ত - ০৬:৩৬
পড়ুন