সারাদেশ | The Daily Ittefaq

বাল্যবিবাহের প্রভাব: ফুলবাড়ীতে পরীক্ষাকেন্দ্রে জেএসসি ও জেডিসির ৯০ ছাত্রী অনুপস্থিত

বাল্যবিবাহের প্রভাব: ফুলবাড়ীতে পরীক্ষাকেন্দ্রে জেএসসি ও জেডিসির ৯০ ছাত্রী অনুপস্থিত
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা১১ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ১৯:২৪ মিঃ
বাল্যবিবাহের প্রভাব: ফুলবাড়ীতে পরীক্ষাকেন্দ্রে জেএসসি ও জেডিসির ৯০ ছাত্রী অনুপস্থিত
ছবিঃ গুগল ম্যাপ থেকে।
উপজেলা প্রশাসনের কড়া নজরদাড়ি সত্বেও কোনক্রমে কমানো যাচ্ছে না বাল্যবিবাহ। ফুলবাড়ী উপজেলায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 
শিক্ষার অভাবে এ উপজেলার অধিকাংশ নারী পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসন ও দেশের নামকরা এনজিও আরডিআরএস বাংলাদেশ, 'বিল্ডিং বেটার ফর গার্লস (বিবিএফজি) প্রজেক্ট'- এর মাধ্যমে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা নিলেও থামছে না তার রাহুগ্রাস। বিভিন্ন সময় বিছিন্নভাবে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দুই চারটি বাল্যবিবাহ ভেঙ্গে গেলেও পরবর্তীতে অভিভাবকরা আবার গোপনে সেই বিবাহ সম্পন্ন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
 
গত ছয় মাসে শুধুমাত্র বালারহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও দাসিয়ারছড়া বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ৩৩ জন শিশু শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। উপজেলায় বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি থাকলেও তা রোধকল্পে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে বাল্য বিবাহের শিকার ওইসব শিক্ষার্থীদের জীবন ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে।
 
উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃঞ্চানন্দবকসী গ্রামের জাবেদ আলী জানান, আমার মেয়ে জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছেলে ভালো হওয়ায় মেয়েকে বিবাহ দিয়েছি। তবে কাজী সাহেব তার মূল ভলিউম বইয়ে বিয়ে রেজিষ্ট্রি করেন নাই। তবে কিভাবে হলো বিবাহ, এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে জানান, ছেলে কিংবা মেয়েদের বয়স ১৮ বছর পুর্ণ না হলেও কম্পিউটারের মাধ্যমে কৌশলে নিবন্ধনের বয়স বৃদ্ধি করে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সুযোগে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ইউনিয়নের কিছু অসাধু কাজীরা ভুয়া নিকাহ নামায় বিয়ে রেজিষ্ট্রি করছেন। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জন্ম সনদ অনুযায়ী নিবন্ধন যাচাই বাচাইয়ের মাধ্যমে দেওয়া হলে, কমে যাবে বাল্যবিয়ে। এর রাহুগ্রাস থেকে রক্ষা পাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। অকালে ঝড়ে পড়বে না আর কোন ফুলবাড়ীর ছাত্রী শিক্ষার্থীর জীবন। 
 
চলতি জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় মুছুল্লীপাড়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসা, মধ্যকাশিপুর দাখিল মাদ্রাসা, ফুলবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বালারহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং দাসিয়ারছড়া বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে রাবনী, সুমি খাতুন, তাসলীমা, রাশেদা,আফিনা, মৌসুমী ও হাসনা খাতুন, শাহিনা, শাহনাজ পারভীন,জুই, আতিকা খাতুন, রহিমা খাতুন এরা সবাই পরীক্ষা দেওয়ার কথাছিল। তারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেও অভিভাবকের অজ্ঞতার কারনে স্বপ্ন গুলো ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে তাদের, যে বয়সে আমাদের মেয়েদের সকালে মায়েরা ঘুম থেকে তুলে পড়া কিংবা আদর করে স্ব-যত্ন মুখে খাবার তুলে দেয়ার সময় ঠিক সেই সময়ে বাল্যবিবাহ দিয়ে তাদেরকেই মা বানিয়ে দিচ্ছেন বাবারা নিজেই। নিজের অজান্তেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন কন্যা সন্তানদের।
 
চলতি পরীক্ষার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল তাদের। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করত ফুলবাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ী মডেল সরকারী জছিমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, ফুলবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মিয়া পাড়া নাজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও শাহবাজার এ এইচ ফাজিল মাদ্রাসা পরীক্ষা কেন্দ্রে। সুশিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাদের। শুরুতে পড়ালেখার চাহিদা ছিল অন্যদের মত। জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষাকেন্দ্রে আসন দেওয়াও হয়েছে তাদের। কিন্তু প্রবেশপত্র প্রতিষ্ঠানের টেবিলে পরে থাকলেও পরীক্ষার্থীর খোঁজ রাখেনি কেউ। তাদের আসনগুলো  ফাঁকা পরে আছে। বেঞ্চে তাদের রোল বসানো থাকলেও স্বামীর সংসারে রয়েছে ওই সব পরীক্ষার্থী। 
 
পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে গিয়ে জানা গেছে, তারাসহ ফুলবাড়ী উপজেলার ৪টি পরীক্ষা কেন্দ্রে এ ধরনের ৯০ ছাত্রী পরীক্ষাথী অনুপস্থিত রয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে বাল্যবিবাহের শিকার। তাদের সহপাঠীরা মনের আনন্দে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও তারা পরীক্ষা দিতে পারেনি। বাল্যবিয়ে হওয়ায় পড়ালেখা থেকে ছিটকে পড়েছে ওই সব শিশু শিক্ষার্থী। 
 
মুছুল্লীপাড়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সুপার নুরুজ্জামান মিঞা ও মধ্যকাশিপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার আবেদ আলী সন্দেহ প্রকাশ করে জানান, অভিভাবকদের বেশি চাপ কিংবা বাল্যবিবাহ সম্পর্কে প্রশাসনকে অবগত করা হলে স্কুলে ভর্তির সময় এর খারাপ প্রভাব পড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এমনকি পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানে ছাত্রী ভর্তি নাও হতে পারে।
 
আবেদ আলী খন্দকার, প্রধান শিক্ষক, ফুলবাড়ী জছিমিঞা সরকারী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় জানান, তার কেন্দ্রেই ৪৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।
 
শিমুলবাড়ী মিয়াপাড়া নাজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন জানান, এবারের জেএসসি পরীক্ষায় ২১ জন মেয়ে পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে। শুনেছি এদের সবার বিয়ে হয়েছে। সে কারণে তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন নি।
 
আরডিআরএস বাংলাদেশ বিল্ডিং বেটার ফর গালর্স (বিবিএফজি) প্রজেক্ট এর উপজেলা ম্যানেজার ঝরনা বেগম জানান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমরা উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে সভা সেমিনার করে যাচ্ছি। অগ্রগতি হচ্ছে। সবার সহযোগিতায় এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। 
 
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাছুমা আরেফিন জানান,অভিভাবকরা সচেতন না থাকায় বাল্যবিবাহ পুরোপুরি রোধ হচ্ছে না। তাই বেশি বেশি করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। তাহলেই বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হবে। 
 
ইত্তেফাক/নূহু
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১০ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৫:০৮
যোহর১১:৫১
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:২৯সূর্যাস্ত - ০৫:১১